স্টাফ রিপোর্টার, পেকুয়া

দিনের আলোয় স্বাভাবিক জনপদ, আর রাত নামলেই যেন বদলে যায় কক্সবাজারের পেকুয়া উপজেলার মগনামা ইউনিয়নের চিত্র। ইউনিয়নের বিভিন্ন পাড়া-মহল্লায় মাদক, জুয়া, চুরি ও ছিনতাইয়ের বিস্তারের অভিযোগে উদ্বেগ বাড়ছে স্থানীয়দের মধ্যে।

অনুসন্ধানে একাধিক স্থানে মাদক বিক্রি ও জুয়ার আসর পরিচালনার অভিযোগ যেমন উঠে এসেছে, তেমনি চুরি ও ছিনতাইয়ে জড়িত একটি সংঘবদ্ধ চক্রের কথাও জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

স্থানীয়দের অভিযোগ ও অনুসন্ধানে জানা গেছে, মগনামা ইউনিয়নের বাজার পাড়ায় সরওয়ার, ছাদেক, লেবাজ উল্লাহ, জাইদুল্লাহ ও রায়হানের বাড়িকে ঘিরে মাদক বেচাকেনার অভিযোগ রয়েছে। একইভাবে মওলার পাড়ার শাহনাজ পারভিন, হারুণ মাতবর পাড়ার শওকত আরার বাড়ি, নুন্যার পাড়ার সাইদুল হক, দেলোয়ার হোসেন ও জিয়াবুল, মিয়াজি পাড়ার হারুণ, আফজলিয়া পাড়ার ইউসুপ, মাঝির পাড়ার রিদুয়ান, পশ্চিমকূলের দেলোয়ার ও নবীর নামও স্থানীয়দের অভিযোগে উঠে এসেছে।

এ ছাড়া ইউনিয়নের সাজিব, মগঘোনার নাজেম, ইদ্রিস, সমশু, দুলা মিয়া, হানিফ, বাদশা, নাসির, নুর নবী, নুর হোসেন, তারমিন ও আবু তালেবসহ আরও কয়েকজনের বিরুদ্ধে মাদক ব্যবসায় জড়িত থাকার অভিযোগ পাওয়া গেছে।

মাদক ব্যবসার পাশাপাশি মগনামায় চুরি-ছিনতাইয়ের একটি শক্তিশালী চক্র সক্রিয় থাকার অভিযোগও উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, বাজার পাড়ার মোনাফ, শরতঘোনার আসিফ, আফজলিয়া পাড়ার সোনাইয়্যা, মঠকাভাঙার দিদার, শুদ্ধুখালী পাড়ার রোকন, কালার পাড়ার হানিফ ও বেদেরবিল পাড়ার মালেকের নেতৃত্বে ৪০ জনের বেশি সদস্যের একটি চক্র বিভিন্ন এলাকায় সক্রিয় রয়েছে।

স্থানীয়দের ভাষ্য, এ চক্রের কয়েকজনের বিরুদ্ধে ডাকাতির মতো গুরুতর ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। অন্যদিকে চক্রের সদস্যদের কেউ কেউ সুযোগ বুঝে বসতবাড়ি, দোকানপাট ও বিভিন্ন স্থাপনায় চুরি-ছিনতাইয়ে জড়িয়ে পড়ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

 

মগনামায় বর্তমানে সবচেয়ে উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে জুয়ার বিস্তার। স্থানীয়দের অভিযোগ, মোবাইল ফোনভিত্তিক ‘বিট’ জুয়ার এজেন্টদের মাধ্যমে ইউনিয়নের বিভিন্ন পাড়া-মহল্লায় জুয়ার কার্যক্রম ছড়িয়ে পড়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, শরতঘোনার জাহেদ, করলিয়াপাড়ার সাদ্দাম, লাল মিয়াপাড়ার তাজু মিয়ার ছেলে কপিল, একই এলাকার সালাউদ্দিন, পশ্চিমকূলের এমরান, বাইন্যাঘোনার আনিছ, চান্দারপাড়ার শওকত ও বেদেরবিল পাড়ার হালিম জুয়ার এজেন্ট হিসেবে কাজ করছেন।

তাদের মাধ্যমে শাহাদাত কবির, কাদের মাঝি, আবু তালেবসহ ৫০ জনের বেশি ব্যক্তি খুচরা মোবাইল বিট জুয়ার সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছেন বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। ফলে তরুণদের একটি অংশও এ ধরনের জুয়ার প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছে এমন আশঙ্কা করছেন অভিভাবকরা।

স্থানীয়দের অভিযোগ, সন্ধ্যার পর থেকেই বিভিন্ন নির্জন পয়েন্ট ও অলিগলিতে মাদকসেবীদের আনাগোনা বাড়ে। নেশাগ্রস্ত অবস্থায় প্রকাশ্যে ঘোরাফেরা ও হৈচৈয়ের কারণে স্থানীয় বাসিন্দা এবং ব্যবসায়ীদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়।

অনুসন্ধানে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মাদকের টাকা জোগাড় করতে না পারলে কিছু মাদকসেবী চুরি, ছিনতাইসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে রাতের বেলায় চলাচলকারী সাধারণ মানুষ, ব্যবসায়ী ও বাড়ির মালিকদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে।

মগনামা ইউনিয়নের বাসিন্দা সাংবাদিক রেজাউল করিম রেজা বলেন, মগনামায় মাদক ও জুয়ার একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট রয়েছে। তারা শুধু ইউনিয়নেই সীমাবদ্ধ নয়, পুরো উপজেলায় মাদক ও জুয়ার নেটওয়ার্ক ছড়িয়ে দিচ্ছে। আর চুরি-ছিনতাই যেন এখানে নিত্যদিনের ঘটনায় পরিণত হয়েছে। দ্রুত তালিকা প্রণয়ন করে পুলিশের সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনার মাধ্যমে অভিযুক্তদের আইনের আওতায় আনা প্রয়োজন। একই সঙ্গে মাদক ও জুয়ার বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধও গড়ে তুলতে হবে।

মগনামা ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান বদিউল আলম বলেন, মগনামায় মাদক ও জুয়ার ভয়াবহতা মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। রাত হলেই চুরির মতো ঘটনা বেড়ে যায়। ইতোমধ্যে মাদকবিরোধী সমাবেশ করে এলাকাবাসীকে সচেতন করা হয়েছে।

মগনামা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ইউনুছ চৌধুরী বলেন, মগনামায় মাদক, জুয়া, চুরি আর নেশার ভয়াবহতা আকার ধারণ করেছে। ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষ থেকে ইতোমধ্যে আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় তালিকাসহ বিষয়টি জানানো হয়েছে।

পেকুয়া থানার ওসি মেহেদী হাসান জানান, পুরো উপজেলায় মাদক, জুয়া আর চুরির বিষয়ে অভিযান অব্যাহত আছে। ইতোমধ্যে মগনামার মাদক আস্তানা বাজার পাড়া থেকে মাদকসহ দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বাকি মাদক ও জুয়ার এজেন্টদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত আছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, মাদক ও জুয়ার সঙ্গে চুরি-ছিনতাইয়ের যোগসূত্র খতিয়ে দেখে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে রাতের বেলায় পুলিশের টহল জোরদার, জুয়ার আসর ও মাদক বিক্রির স্থানগুলোতে অভিযান এবং অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন তারা।